আমাদের সুপারম্যান ০২ - IT Protidin
সুপারম্যান

আমাদের সুপারম্যান ০২

by admin
96 views

আমাদের সুপারম্যান ০২

ধারাভাষ্যে সম্ভবত তখন নাসের হুসেইন। ৯৯তে দাঁড়িয়ে তিনি, ভয়-ডর ভুলে এ্যাডাম মিলনের শর্ট বলটাকে কিপারের মাথার উপর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সীমানা দড়ির ওপারে। ছয়। মাক্রোফোনে গমগম কন্ঠে বলে উঠলেন নাসের, “হি ইজ দ্য সুপারস্টার অব বাংলাদেশ ক্রিকেট। এন্ড হি প্লেইড লাইক এ সুপারস্টার, টুডে।”

টিভি সেটের এপ্রান্তে আমাদের চোখের জল আটকে রাখা দায়! তিনি শুধু সেদিন নয়, আরো অনেকবার আমাদের চোখে এমন বাঁধভাঙা জলের উপলক্ষ্য সৃষ্টি করেছেন। আনন্দে আত্মহারা হওয়ার উপক্রম হয়েছে আমাদের।

আমরা তাঁর অতিমানবীয় কীর্তির স্বীকৃতি দিতে তাঁকে আমাদের ‘সুপারম্যান’ অভিধায় ভূষিতও করেছি। আজকের গল্পটা আমাদের সুপারম্যানের তেমনই কোনো এক ‘সুপারম্যান’ শো নিয়ে। পুরো লেখায় কোথাও আমরা তাঁর নাম নেবো না, বলবো না কোন সময়ের কোন ম্যাচের গল্প বলা হচ্ছে; আমরা শুধু তাঁর কোনো এক সময়ের অতিমানবীয় কীর্তির স্মৃতিচারণা করবো।

_________

ইনিংসের মাত্র চতুর্থ ওভার, তিন-তিনজন ব্যাটসম্যান ফিরে গেছেন সাজঘরে। বসেছেন কি বসেননি অমনি ডাক পড়লো তাঁর! ১০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বিপর্যস্ত দলকে টেনে তোলার কঠিন সংকল্পে ২২ গজের দিকে হেঁটে গেলেন তিনি।

খানিক বাদে দলপতিও তাঁকে রেখে ফিরে গেলে, বাংলাদেশ ১৬ রানে হারিয়ে বসল ৪ উইকেট।

প্রতি আক্রমণের চেষ্টায় উমর গুলকে দু’দুটো চার মারলেন। কাজ হলো না। হাসফাঁস ভাবটা কাটানো গেল না, উলটো ফাঁসটা যেন আরো শক্তভাবেই আটকে বসল। সেই চাপের ফলেই হয়তো কিছুক্ষণ পর হারালেন ওপাশের সঙ্গীকে। ৪৫ রানে অর্ধেক নেই হয়ে গেল বাংলাদেশের। এরপর স্বীকৃত ব্যাটসম্যান বলতে একমাত্র তিনিই। লেজ নিয়ে কতটা ঝাপটাতে পারবেন তিনি? আদৌ পারবেন কি? একুশের ছোকরা, রক্তে উচ্ছলতা, তারুণ্যের ছটফটে ভাব কাটিয়ে কতটা টানা সম্ভব?

ষষ্ঠ উইকেটে ৩৭ রানের জুটি দিয়ে যেন বোঝাতে চাইলেন, যতদূর সম্ভব লড়ে যাবেন তিনি। যদি তাঁর সাথে আজ কেউ না-ই-ই-ই আসে, তবে একাই লড়বেন। তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই একা করে দিয়ে উইকেট রক্ষকও ফিরে গেলেন, মিনিট কয়েকের ব্যবধানে। ৮৪ রানে নেই ৭ উইকেট। আর লড়ার দরকার কি? হাল ছেড়ে দিলেই তো পারেন!

হালই যদি ছাড়বেন, তবে তিনি আর ‘তিনি’ কেন? পরের নয় ওভারে ঠুকে ঠুকে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেলেন। কোনো চার মারেননি, ২৭ বলে নিয়েছেন ১৬! ৮ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন ১০৯!

৩০ ওভারই পেরোয়নি, পুরো ওভার খেলা হবে কি না, তাই নিয়ে বেঁধে গেল সংশয়!

ক’দিন আগেই পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, তাঁকে আর তাঁর দলনায়ককে জেমি সিডন্স নাকি আলটিমেটাম দিয়েছেন। সময়টা এমন যে, সরকারী দল আর বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচী আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমন্বয়ে ‘আলটিমেটাম’ শব্দটার কেমন এক তাৎপর্য বাড়িয়ে দিয়েছে! সেই তাৎপর্যের প্রভাব দলনায়কের মধ্যে দেখা না গেলেও, দেখা গেল তাঁর মধ্যে। আগের ম্যাচেই বাংলাদেশ দুর্দান্ত লড়াকু ক্রিকেট উপহার দিয়েছিল তাঁর ৭৩ বলে ৭৫ এর উপর ভিত্তি করেই। এদিন আবার সেই দুরন্ত ব্যাটিং-ই কেমন শান্ত আর নির্লিপ্ত হয়ে গেল, দলের বিপর্যয় এড়াতে। লজ্জা তাড়াতে।

নবম উইকেটে, দশম সঙ্গীটি তাঁর স্বার্থক ‘সঙ্গী’ হয়ে উপস্থিত হলেন। তখন কে জানতো, সেই জুটি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সেদিন যেমন সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছিয়ে দিয়েছিল, ঠিক এক দশক পর সেই জুটির হাত ধরেই বাংলাদেশ, বিশ্ব ক্রিকেটের কোনো এক সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছার চেষ্টা করবে! তাঁরাই হবেন দিন বদলের রুপকার, স্বপ্নপূরণের সারথী!

সঙ্গীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস দেখে তিনিও হয়ে উঠেন নির্ভার। খোলসে ঢুকিয়ে ফেলা নিজেকে বের করে আনেন, নিজের খেলাটাই আবার খেলতে শুরু করেন। সেই একই রকম, ভয়ডর-হীন; নিরুদ্বেগ, স্বাভাবিক ক্রিকেট।

নিজের খেলাটা উপভোগ করতে পারলে তাঁর মতো ‘ভালো’ সেদিন আর কেউ থাকেন না। পরাজিত দলের হয়েও ম্যাচসেরা পুরস্কার তা-ই প্রমাণ করে। উপভোগ করতে করতে একসময় ৯৮তে থমকে দাঁড়ান। পরপর তিনটে বল ডট দিয়ে এক নিয়ে পৌঁছুলেন ৯৯তে। ওদিকে ওভার হয়ে গেছে ৪৬, যা করার করতে হবে তাড়াতাড়ি। নার্ভাস নাইন্টিজে দাঁড়িয়ে যে নার্ভাসনেসে ভুগবেন সে স্বাধীনতাও তাঁর নেই। পরের ওভারের প্রথম বলে দুই নিয়ে পৌঁছে গেলেন নিজের দ্বিতীয় শতকে, শাহরিয়ার নাফিসের পর প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার, যার একদিনের ক্রিকেটে একাধিক শতক আছে! উদযাপনেও আশ্চর্য্য নির্লিপ্ত তিনি। কোনো লাফঝাঁপ নেই, নেই মুষ্টিবদ্ধ বা মুষ্টি ছোঁড়া কোনো উদযাপন। সাজঘরের দিকে তাকিয়ে, সতীর্থদের দিকে ছোট্ট একটি বাউ! ব্যস,  তার শতক-উদযাপন শেষ!

এর পরের গল্পটা খুব ছোটো। রান বাড়ানোর তাড়নায়, তাঁর ৯৭ দৌঁড়ের সহযোগী, তাঁর সঙ্গী তেড়েফুঁড়ে খেলতে গিয়ে বল ভাসালেন হাওয়ায়, থামলেন ৩৮-এ। পরের ওভার মেইডেন দেয়া ১১ নাম্বার ব্যাটসম্যানের ছয়টি বল ‘ঠেক’ দেয়া ক্রিকেটের পর, পঞ্চাশতম ওভারের প্রথম বলে শেষ হলো তাঁর কঠিন-বিপদ সংকূল যাত্রা!

১২০ বলে ১০৮ রান করে থামলেন তিনি, পুরো ইনিংসে চার মারলেন ৮টি! নেই কোনো ছয়।

তিনি সেই মানুষ, যিনি একই সাথে বন্য আক্রমণ আর শান্ত নদীর স্থিরতা, অঙ্গে-প্রাণে-মননে-মস্তিষ্কে সযতনে লালন করেন। সময়ের সাথে নিজের মধ্যেই যেন সুইচ বসিয়ে নেন, কখনো উচ্ছ্বল অশান্ত, কখনো ধীরস্থির শান্ত; কখনো ধ্বংসোন্মাদ, কখনো ইটের পর ইট গেঁথে যাওয়া কোনো সুনিপুণ শিল্পী!

আমরা তাঁকে দেখি, আর দেখি, আর পুলকিত মনে বলি, সুপারম্যান! আমাদের সুপারম্যান।

লিখেছেন: MD Yasir Irfan 

আমাদের সুপারম্যান ০১ পড়ুন। আইটি প্রতিদিনের সাথেই থাকুন।

Related Posts

Leave a Comment