আমাদের সুপারম্যান ০৩ - IT Protidin
সুপারম্যান

আমাদের সুপারম্যান ০৩

by admin
55 views

আমাদের সুপারম্যান ০৩

ধারাভাষ্যে সম্ভবত তখন নাসের হুসেইন। ৯৯তে দাঁড়িয়ে তিনি, ভয়-ডর ভুলে এ্যাডাম মিলনের শর্ট বলটাকে কিপারের মাথার উপর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সীমানা দড়ির ওপারে। ছয়।

মাক্রোফোনে গমগম কন্ঠে বলে উঠলেন নাসের, “হি ইজ দ্য সুপারস্টার অব বাংলাদেশ ক্রিকেট। এন্ড হি প্লেইড লাইক এ সুপারস্টার, টুডে।”

টিভি সেটের এপ্রান্তে আমাদের চোখের জল আটকে রাখা দায়! তিনি শুধু সেদিন নয়, আরো অনেকবার আমাদের চোখে এমন বাঁধভাঙা জলের উপলক্ষ্য সৃষ্টি করেছেন। আনন্দে আত্মহারা হওয়ার উপক্রম হয়েছে আমাদের।

আমরা তাঁর অতিমানবীয় কীর্তির স্বীকৃতি দিতে তাঁকে আমাদের ‘সুপারম্যান’ অভিধায় ভূষিতও করেছি। আজকের গল্পটা আমাদের সুপারম্যানের তেমনই কোনো এক ‘সুপারম্যান’ শো নিয়ে। পুরো লেখায় কোথাও আমরা তাঁর নাম নেবো না, বলবো না কোন সময়ের কোন ম্যাচের গল্প বলা হচ্ছে; আমরা শুধু তাঁর কোনো এক সময়ের অতিমানবীয় কীর্তির স্মৃতিচারণা করবো।

_________

সিরিজ শুরুর আগেই প্রতিপক্ষের অধিনায়ক সাগ্রহে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ দলে তাঁরা সবচেয়ে বড় ভয় কাকে করেন! কাকে সামলানোটা কঠিন তাদের জন্য! বিশ্ব ক্রিকেটের চুনোপুঁটি দলের কোন ক্রিকেটারটিকে তাঁরা মনে করেন রাঘব বোয়াল! সেই ‘রাঘব বোয়াল’ ক্রিকেটারটিকেই যে তাঁরা তাদের পথের প্রধান কাঁটা মনে করেন, তাও জানিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রতিপক্ষের অধিনায়ক হলেও বেশভূষোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপকের মতো ভদ্রলোকটি তখনো জানেন না, তাঁর আশংকা কি নিদারুণ সত্যি হয়ে অপেক্ষা করছে অনাগত ভবিষ্যতে!

টসে জিতলেন স্বাগতিক-দলনায়ক। প্রথমবারের মতো তিনি দেশের মাঠে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শুরুর ব্যাটসম্যানরা সূচনাটাও ভালো করলেন। স্বাগতিক দলপতি কিছুটা বুঝি নির্ভার। ঠিক একশ রানের মাথায় তৃতীয় উইকেট হারালো বাংলাদেশ, এই সময় মঞ্চে ডাক পড়লো আমাদের আজকের নায়কের। তিনি এলেন, মুখোমুখি হলেন তাঁরই, যিনি তাঁকে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বলে অভিমত দিয়েছিলেন।

চশমা পরিহিত লোকটির প্রথম বলটিকে অফ সাইডে ঠেলে দিয়ে রানের খাতা খুললেন তিনি। এন্ডি ম্যাকাইকে দুই চার মেরে বুঝিয়ে দিলেন, সারা বছর যে ফর্ম তিনি ব্যাটে বয়ে চলেছেন, সেটাই আজকেও খুব গুছিয়ে নিয়ে এসেছেন এই ভরা মজলিসে প্রদর্শন করবেন বলে!

তিনি তাঁর মতো খেললেও ওপাশ থেকে সেরকম সহযোগিতা পাচ্ছেন না। একের পর এক সঙ্গী হারাচ্ছেন, ওদিকে রান রেটটাও খুব সুবিধের নয়। ৪৫ ওভার পেরিয়ে গেলেও দুইশ পেরোলো না বাংলাদেশ। তরুণ সাউদীর উপর চড়াও হলেন, নতুন স্পেলে তাঁকে মাত্রই এনেছেন অধিনায়ক, পরপর দুই চার মেরে তাঁকে স্বাগত জানালেন তিনি।

পরের ওভারে আবার সঙ্গী-হারা হলেন। তাঁর নতুন সঙ্গী হিসেবে মাঠে নামলেন স্ব-দলপতি। সেই ওভারেরই শেষ বলে ম্যাকাইয়ের মাথার উপর দিয়ে চার মেরে পঞ্চাশ পূর্ণ করলেন তিনি, এই দূর্যোগের কালেও খেললেন মোটে ৪৭ বলে! একই সাথে বাংলাদেশও পেরিয়ে গেল দুইশ, ৪৭ ওভারে।

পরের ওভারে আবার মিলসকে দু-দুটো চার মারলেন। রান বাড়ানোর তাড়নায় মিলসের উপর আরো চড়াও হতে গিয়ে তাঁর স্ট্যাম্প খোঁয়ালেন তিনি। মাত্র ৫১ বলে ৮ চারে ৫৮ রানের ঝলমলে ইনিংসটার সমাপ্তি ঘটলেও, সমাপ্তি ঘটলো না তাঁর অবিশ্বাস্য কারিকুরির!

****

বার্থডে ম্যান! বাংলাদেশ অধিনায়ক।

তৃতীয় ওভারের দৌঁড় শুরু করতেই পড়ে গেলেন বিপজ্জনক ভঙ্গিমায়। আৎকে উঠে গ্যালারী থেকে টিভি সেটের সামনে থাকা দর্শকরাও। গত ন’বছরে এই লোক কতবার যে এভাবে পড়লেন! সর্বশেষ কিংসটাউন থেকে দু’জন সতীর্থের কাঁধে ভর দিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি। মাঠ ছাড়লেন আবার।

তাঁর কেমন লেগেছিল জানি না, তবে আমাদের হৃদস্পন্দন ভয়ংকর গতিতে দ্রুততর হয়ে উঠেছিল!

মঞ্চ আবার স্বাগত জানালো সময়ের মহান পুরুষটিকে। নিয়মিত অধিনায়ক মাঠ ছাড়তেই নেতৃত্বের গুরু দায়িত্ব চেপে বসল তেইশ বছরের নবীনের কাঁধে। আগের বারও যখন দলপতি তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে উঠে গিয়েছিলেন, তখনও তিনি নিরাশ করেননি সমর্থক ও অধিনায়ককে। এবারও কি তেমন কিছু করতে পারবেন?

স্কোর বোর্ডে খুব বেশী রান জমা দিতে পারেনি তাঁর ব্যাটসম্যানরা। অধিনায়ক ময়দান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। একই সাথে একজন বোলারও কমে গেছে তাঁর। এই কঠিন দূর্যোগ ক্ষণে প্রতিটি সিদ্ধান্তই মহা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কি যে করবেন!

রাইডার-ম্যাককালাম মিলে বেধড়ক পেটাতে লাগলেন। উপায়ান্তর না দেখে দুই পাশ থেকেই স্পিন নিয়ে আসলেন। একজন বাঁহাতি অর্থোডক্স, আরেকজন ডানহাতি অফব্রেক। কাজ হলো না তাতেও। ৬ ওভারেই প্রায় পঞ্চাশ রান পেয়ে গেছে অতিথি দল। দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানই খুব মারছেন। রুখে দাঁড়ানোর প্রয়োজনে নিজেই সামনে এলেন এবার। বল হাতে নেয়ার পঞ্চম বলের মাথায় কাংখিত ব্রেক থ্রু এনে দিলেন দলকে, থামালেন রানের ধাবমান চাকাটাও আমাদের সুপারম্যান!

ওপাশে যে ম্যাককালাম নামের এক নির্দয় লোক আছেন। তিনি তো বল নামের চর্ম গোলকটাকে কেবল পেটাতেই শিখেছেন, তাই তাঁকে থামানো না গেলে যে থামানো যাবে না অতিথিদের, জুটবে হয়তো পরাজয়ও!

খানিক বাদে আবার আক্রমণে ফিরলেন তিনি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। কালো মাটির পিচটা কেমন কাঁদা কাঁদা ঠেকছে। তিনি কাঁদা মনে হওয়া মাঠে খেললেন মাস্টারস্ট্রোক! ম্যাককালামকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেললেন, দুই বল পর তাঁর শিকার হলেন ম্যাথু ইলিয়ট।

১৪.১ ওভারে ৮৫/২ থেকে অতিথিরা ১৫ ওভার শেষে পরিণত হলো ৮৫/৪ এ। যার তিনটিই গেছে তাঁর ঝুলিতে, দুটি আবার একই ওভারে!

ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা বেড়ে যেতে ডাক পড়লো মাঠ কর্মীদের। বৃষ্টি শেষে যখন খেলা আবার শুরু হচ্ছে, কঠিন এক লক্ষ্যের সামনে পড়ে গেল প্রতিপক্ষ। যার মূলে ছিল তাঁর ওই ১৫তম ওভার এবং দুটি উইকেট!

গল্পটা প্রায় শেষ। ‘মাস্টার’ তাঁর মাস্টারস্ট্রোকে আগেই বাজিমাত করে দিয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে বড় ‘মাত’ করলেন শেষের আগের ওভারে। ১২ বলে ২১ দরকার, এমন সন্ধিক্ষণে বোলিংয়ে এসে, ৩ রান দিয়ে তুলে নিলেন ন্যাথান ম্যাককালামের মহামূল্যবান উইকেট। ৪১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে দলের জয় নিশ্চিত করে দিলেন অনেকাংশেই।

শেষ ওভারে, সঙ্গীর জন্য রেখেছিলেন ৬ বলে ১৮। শেষ ওভারে আট রান দিয়ে, বাংলাদেশ পেয়ে যায় ৯ রানের অবিস্মরণীয় এক জয়।

যার পুরোভাগে, কেবল ও কেবলমাত্র ছিলেন তিনিই!

এর আগে তিনি তাঁর অতিমানবীয়তা দেখিয়েছেন হয় বলে, নয় ব্যাটে! কিংবা কখনো ব্যাটে-বলে দুটোতেই, আংশিকভাবে। এমন একা হাতে ব্যাটে আর বলে কারিকুরি আর তাঁর মস্তিষ্কের অমন স্বার্থক ব্যবহার এর আগে যে কখনো দেখা হয়নি!

তাঁর অতিমানবীয়তা নিয়ে কিঞ্চিত সংশয় যদি থেকেও থাকে, সেদিনই যেন সব ধুয়ে মুছে সাফ করে দিলেন তিনি।

হলিউডের হয়তো কোনো ফিল্মী-সুপারম্যান আছে, কিন্তু আমাদের আছে একজন রক্ত মাংসের সুপারম্যান। আমাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, ক্রিকেট মাঠে তিনি সব পারেন। যে কোনো মুহূর্তে, যে কোনো পরিবেশে, যে কোনো সন্ধিক্ষণে, তিনি ঠিক দাঁড়িয়ে যাবেন।

হয় ওই ছোট্ট কাঠখন্ডে, নয় ওই চর্মগোলক নিয়ে!

Yasir Irfan

আমাদের সুপারম্যান ০১ এবং ০২ পড়ুন। আইটি প্রতিদিনের সাথেই থাকুন।

Related Posts

Leave a Comment